শনিবার । ২৫শে এপ্রিল, ২০২৬ । ১২ই বৈশাখ, ১৪৩৩

সমর্পন

মোঃ হাবিবুর রহমান

কেরসিনের কুপিটা তখনও জ্বালানো ছিল। মাজু বিবি কী করবে ভেবে পাচ্ছিল না। শেষ রাতের জমাট অন্ধকারের মতো তার বাকী জীবনটা অন্ধকারে ঢেকে গেল। পঞ্চাশ বছরের বিবাহিত জীবনের অবসান হয়ে গেছে। রহিমদ্দী কিছুক্ষণ পূর্বে ইহলোক ত্যাগ করেছে। অনেকদিন ধরে নানা রকম রোগ শোকে তার বিছানায় কাটানো জীবন ছিল যন্ত্রনাময়। মরণের সময় সে বউ মাজুবিবিকে কাছে ডেকে জড়ানো কন্ঠে কিছু বলতে চেয়েছিল। কিন্ত অসম্ভব যন্ত্রনায় মুখ থেকে কোন কথা বের হয়নি।

মাজু বিবি ও রহিমদ্দীর সংসারে কোনো সন্তানাদি হয়নি। অনেকেই রহিমদ্দীকে বলেছিল আবার বিয়ে করতে, কিন্ত কে শোনে কার কথা। ছোটবেলায় মাজু বিবিকে শাদী করে ঘরে আনে রহিমদ্দী। মাজু বিবির বয়স তখন সাত কি আট হবে। রহিমদ্দীর বয়স তেরোর কোঠায়। শুরু থেকে সংসারে তেমন সচ্ছলতা ছিল না। গাঙে জাল ফেলে মাছ ধরে চলতো দুজনের সংসার। রহিমদ্দীর আদি বাড়ি কোথায় তা কেউ বলতে পারেনা। কোনো এক সময় নাকি খড়ের গাদার সাথে ভাসতে ভাসতে ভাটির দেশে চলে আসে। গ্রামের মহাজনের বাড়িতে কামলার কাজ করে বড় হয়েছে। বিয়ে শাদি করে আলাদা ঘর তোলে। রহিমদ্দীর বাবা মায়ের কথা মনে পড়েনা। দুঃখ যেন তাকে চারদিক থেকে ঘিরে রেখেছে। মাজু বিবিকে বিয়ে করে তার কিছুটা হলেও শান্তি হয়েছে। আর কিছু নাহোক তিন বেলা রান্না করে একজন তার জন্য বসে থাকে সেটা ভেবে রহিমদ্দীর খুশীর সীমা থাকে না। সপ্তার বাজার থেকে গুড়মুড়ি কিনে খাওয়ায়, সন্দেশের দলা গাটিতে করে বাড়ি ফেরে। সন্ধ্যা বেলা মাজু বিবি পথ পানে চেয়ে থাকে। এজন্য তাকে প্রতিবেশী ভাবীদের অনেক খোঁচা সহ্য করতে হয়েছে। একবার প্রচন্ড জ¦রে মাজুবিবির মরণাপন্ন অবস্থা হলো। কাঁপুনি দিয়ে জ¦র, সাত দিনে শরীর ভেঙে একবারেই কাহিল অবস্থা। বাঁচার কোনো আশাই ছিল না। রহিমদ্দীর সেকি অস্থিরতা, একবারে পাগল প্রায়। কবিরাজ ডাকে, বৈদ্যি খোঁজে, ওষুধ পত্রের কোনো কমতি করে না। পাশের বাড়ির রমিছা রহিমদ্দীকে ডেকে বলে, “শোন দেবর জ¦ী তোমার মতো একটা মানুষ পেলে আমার জীবন ধন্য হয়ে যেত। আমার স্বামী তোমার মতো না, আমাকে শুধু মারে, যত্ন তো করে না, রাত করি বাড়ি ফিরে নাক ডাকায়ে ঘুমায়, আবার যখন তার পশুত্ব জাগে তখন বন্য জানোয়ার হয়ে শরীলটারে আমার ছিঁড়েখুড়ে খায়। তুমি কতো ভালো। তোমার মাজুকে আগলে রাখো।”
রহিমদ্দির সে সব কথায় কান দেয় না।

ইউনিয়নের চেয়ারম্যান থেকে অনুমতি নিয়ে ওয়াপদার বাঁধের বাইরে খোলটপটুয়ার চরে সরকারী খাস জায়গায় রহিমদ্দী দোচালা ঘর তোলে। চরের মাটি বাতাস একবারে চেনা তাদের। জোয়ারের পানি তাদের বসতভিটার একবারে কাছে চলে আসে। ভাটায় আবার সে পানি দূরে চলে যায়। রাতে পানির ছলাৎ ছলাৎ শব্দে রহিমদ্দীনের ঘুম ভেঙে গেলে জাল নিয়ে বাইরে বেরিয়ে পড়ে। ভোরের আলো ফোটার আগেই একব্যাগ মাছ নিয়ে সে হাজির হয়। কিছু নিজেরা খায় এবং বাকি বাজারে বিক্রি করে দেয়। যে দিন বেশী মাছ ধরতে পারে সেদিন রহিমদ্দীনের খুশীর সীমা থাকে না। জোর গলায় দূর থেকে ডাকবে, “বউ, এই মাজু তাড়াতাড়ি ওঠ দ্যাখ কতো মাছ পাইছি। কাট দেখি, কিছু মাছ রান্না কর, ভোলা মাছটা রানবি কলাম ওটা আমার খুউব পছন্দের।” মাজু বিবি তাড়াতাড়ি পড়িমরি করে উঠে বসে। জোরে হাই তুলে বলে, “আসি গো। হাকডাক কম করও দিকি। সবাই ঘুমোচ্ছে, তোমার জ্ঞান নেই নাকি।”

নারে বউ মাছ পালি আমার জ্ঞান থাকে না। নে ধর খালইটা ধর, দেখ কত মাছ। রহিমদ্দিনের গায়ে নদীর চরের থকথকে কাদা।
মাজু বিবি তবু গজগজ করে, মাছ যেন আর কেউ খায় না।

গামছা আর দাতনটা এগিয়ে ধরে বললো, “গা ধুয়ে আসো দেকিনি, তোমার গায়ে অনেক কাদা লাগি আচে।”

“থাকনা কাদা, তাতে তোমার কী?” বলেই রহিমদ্দি একগাল ফোকলা হাসি দিয়ে মাছগুলো উঠোনে ঢেলে দিয়ে আরও জোরে হাসতে থাকে।

বাজার মাছগুলো বিক্রি করে অনেক টাকা হয়েছে। রহিমদ্দী বউ এর জন্য আলতা, স্নো, পাউডার কিনলো। দোকানদার তার সাথে মস্করা করে বললো, “কিরে রহিমদ্দী বউকে খুব ভালোবাসো নাকি? তোমার বউ আজকে খুশী হবেনি।” রহিমদ্দি বলে, “হ, হবেনে তুমি কইলে।” মনে মনে রহিমদ্দি খুব খুশী, হাতের গামছা কাঁধে তুলে দোকান থেকে হন হন করে সে বেরিয়ে পড়ে।

মাজু বিবি বাজা বলে অনেকের গালমন্দ শুনেছে। সন্তান হয় না তাতে তার কী দোষ সে আজও জানে না। শহরের ডাক্তার দেখিয়ে রহিমদ্দির দোষ ধরা পড়ে। সেই থেকে রহিমদ্দি মাজুকে বেশী যত্ন খাতির করতে থাকে। মাজুকে কিছু বলে না। বউ যদি মনে মনে কিছু ভাবে। কওন তো যায় না।

মাজু বিবি স্বামীর পায়ের কাছে বসে চোখের জল ফেলতে থাকে। সারা রাজ্যের নিরবতা তার জীবন জুড়ে নেমে এসেছে। বুকের মধ্যে শূন্যতা খা খা করে ফিরছে।

কবর খোড়া শেষ প্রায়। বাঁশের জোগান হয়ে গেছে। দোকান থেকে কাফনের কাপড় আনা হয়েছে। জানাযার জন্য মসজিদের হুজুরকে ডাকা হয়েছে। উপস্থিত সবার চোখে জলের ধারা। রমিছা মাজুকে জড়িয়ে আছে। এমন দুঃখের দিনে রমিছা মাজুকে ছেড়ে থাকেনি। সারাক্ষণ তার সাথে থেকে শান্তনা দিয়ে গেছে।

জানাযা শেষে রহিমদ্দিকে কবরে শুয়ে দিয়ে শেষ কাজগুলি সারা হলো। রহিমদ্দির দাফনের সাথে সাথে মাজুবিবির সকল স্বপ্ন দাফন হয়ে গেল। একটি মানুষের চলে যাওয়া কতোটা বেদনার হতে পারে তা মাজুবিবি আজ বুঝতে পারছে। পৃথিবীর সব আঁধার আজ তার চোখে। বিষন্ন মাজুবিবি রমিছাকে জড়িয়ে ধরে কেঁদেই চলেছে। রমিছা কোনো ভাষা দিয়ে মাজুকে শান্তনা দিতে পারছে না। তবুও সাহস করে বললো “বইন আর কান্দিস না। সবার কপালে সুখ থায়ে না। মানুষটা তোকে কত্তো সোহাগ করতো, কান্দিসনারে। মাজু বিবি আরও জোরে রমিছাকে জড়িয়ে কান্নার শব্দ বাড়িয়ে দিল।

সন্ধ্যাবেলা ঘরের আলো না জ¦ালিয়ে মাজুবিবি বারান্দায় বসে রইল। রমিছা থালায় ভাত এনে মাজুকে খাওয়ার কথা বললো। কে শোনে কার কথা। দূর দৃষ্টিরত স্বামীর কবরের দিকে তাকিয়ে রইল। সব শূন্যতা এখন তার জীবনে। মাজু বিবি চিৎকার দিয়ে বলে উঠলো, “রমিছারে খোদা কেন তাকে বাঁচিয়ে আমারে নিল না। ক্যান নিল না, ক্যান?”

(লেকক : প্রভাষক, নওয়াবেঁকী কলেজ, সাতক্ষীরা।)

 

খুলনা গেজেট/এনএম




খুলনা গেজেটের app পেতে ক্লিক করুন